এক.
ইসলামী সঙ্গীতের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মধ্যে একটা রুহানিয়্যাত ও নিষ্ঠার ব্যাপার থাকা জরুরী। না থাকলে সেইটে আর ইসলামী সঙ্গীত থাকে না। হয়তো সঙ্গীত নয়তো সক্রিয়তা হয়ে যায়। ইসলামী সঙ্গীতের কথা, সুর, ভাব, তাল-লয় ও বক্তব্য সবই চলতি সঙ্গীত বা পেশাগত মিউজিক্যাল সঙ্গীতের আবহ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এখন আপনি যদি চলতি ট্রেন্ড আর বড় বড় উস্তাজ লোকদের সুর, সঙ্গীত, কথা আর প্রেজেন্টেশন আপনাকে উদ্ধুদ্ধ করে; আর সেইভাবে বলিউডি কায়দায় নিজেকে উপস্থাপন করেন-- তাহলে আপনার আর কোন কিছুই মৌলিক থাকলো না। ধার করা। এইসব সক্রিয়তা দিয়ে আপনার লাভ হলেও ইসলামের ও ইসলামী সংস্কৃতির কোনই লাভ হবে না।
আপনি আপনার অডিয়েন্সের চাহিদায় যদি কখনও আটকে যান; তাহলে কখনও আল্লাহর জন্য সেই চক্র থেকে বের হতে পারবেন না।
দুই.
ইসলামী সঙ্গীতের গীতিকার মূলত দাঈ। শিল্পের কচকচানি আর শব্দনৃত্য তার কাজ নয়। তার কাজ বাণী ও বাণী পরম্পরা তৈরি করে বক্তব্য তৈরি করা। 'গিমিক' আর চমকে নির্দিষ্ট মাল্টিপল শ্রোতাকে সন্তুষ্ট করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে এরা আসলে ইসলামী সঙ্গীতের শ্রোতাই না। এরা মৌলিকভাবে সফট-হার্ড রক শুনে। রবীন্দ্রনাথ শুনে। হিন্দি ক্ল্যাসিক্যাল শুনে। আর সেইরকম কিছু হলেই তারা বাহবার ডালি নিয়ে হাজির হয়। তারা তখন ইসলামী সঙ্গীতের সীমানা, সমর্থন ছাড় ও উদ্দেশ্য ভুলে কেবল সঙ্গীতটাই সামনে রাখেন।
আরেকদল বাজার অর্থনীতির বাইরে এই ইসলামী সঙ্গীত নিয়ে কিছুই ভাবতে পারে না। তারা সুর আর ভোকালের ব্যবহার ছাড়া ইসলামী সঙ্গীতকে নিয়ে বিশেষ কোন পরিকল্পনাই রাখে না। ফলে ভিউ, স্পন্সর ঠিক থাকলে আর কোথাও ডেভেলপমেন্টের প্রয়োজন মনে করে না। তারা বিশেষ কোন আইডিয়া জেনারেট করে না। ভারি ও গভীর ভাবের কোন লিরিক তাদের রুচিতে লাগে না। ফলে দীর্ঘ জার্নি ও অগণিত কন্টেন্ট থাকার পরেও এই অঞ্চলের ইসলামী সঙ্গীতের বা ইসলামী ঘরাণার বুদ্ধিজীবীদের আনুকূল্য পায় না। তাদের নিয়ে সবসময়ই একটা অস্বস্তি সিনিয়রদের মধ্যে চলতেই থাকে।
ইসলামী সঙ্গীতের শব্দ ভাষা হবে বোধগম্য এবং গণমূখি। এলিটমূখী আরবি ও উর্দুমিশেলে নিয়মিত গীত রচনা গণমানুষের আপন হতে পারবে কমই। একটা বৃত্তবন্দি সঙ্গীত হিসেবেই থেকে যাবে।
সম্প্রতি উর্দু নাশীদের একটা জোয়ার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এইটাও একসময় ব্যাকফায়ার করতে পারে। এই দেশের বহু বড় বড় শিল্পিই আন্তর্জাতিকতা পায়নি। যারা কিছুটা পেয়েছেন তারাও বাংলার জন্যই। ভিন্ন ভাষার জন্য না। ভিন্ন ভাষা মাঝেমধ্যে ভিরিয়েশনের জন্য সুন্দর। কিন্তু নিয়মিত বহু কন্ট্রোভার্সি তৈরি করতে পারে। পলিটিক্যাল সংকট ও কালচারাল অস্থিরতা তৈরি করতে পারে আমাদের মুনাশশীদদের ক্রমাগত উর্দুপ্রীতি। এছাড়াও যখন নেটিভদের কাজগুলো সামনে থাকবে; তখন এখানে স্রোতের অনুকূলে ভেসে আসা উর্দু গায়করা হতাশায় নিমজ্জিত হবে।
তিন.
সম্প্রতি বিতর্ক চলছে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে। ইসলামী সঙ্গীতে কেউ কেউ মিউজিক ব্যবহার করছেন। একটা সঙ্গীত একটু ব্যাপকতা লাভ করলেই এর মধ্যে মিউজিক থাকার অভিযোগ আসতে থাকে।
এখানে বেশ কিছু আলাপ ও টিকা-টিপ্পনীর ব্যাপার আছে। আসলেই মিউজিক থাকে; না থাকে না। অথবা থাকে; কিন্তু শিল্পী ও কলাকুশলী অস্বীকার করে। অথবা থাকেই না। অতি সচেতনতা অথবা ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের ভিত্তিতে অভিযোগ করা হয়! নাকি আমাদের ইসলামী সঙ্গীত সংশ্লিষ্ট মানুষেরা ভেবেই নিয়েছেন যে; হালকা মিউজিক তারা দিবেনই। জনতা যা বলার বলতে থাকুক!
এখন আসেন কিছু আলাপ ভিন্নভাবে করি। প্রচলিত অর্থে বাজনা আসলে কী? যে কোন বাদ্য যন্ত্রের আওয়াজকেই আমরা বাজনা বলবো। সেটাতে তাল থাকুক বা না থাকুক। দফ এর বাইরে থাকবে।
এখন কেউ বলছেন আমরা কোন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করিনি। এর অর্থ হতে পারে; আমরা কম্পিউটারে বানানো কিছু সাউন্ড ব্যবহার করেছি। অথবা প্যাড ব্যবহার করেছি। অথবা কিছু প্লাগিন ব্যবহার করেছি। অথবা একেপেল্লা (মুখে হাতে তৈরি সাউন্ড) ব্যবহার করেছি। এখন প্লাগিনগুলো কী! এইগুলো কি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে বানানো? নাকি বিশেষ কোন সাউন্ড ব্যবহার করে বাজনার বিকল্প হিসেবে বানানো?
এইখানে দুইটা প্রশ্ন। এইযে একেপেল্লা অথবা ভিন্ন উৎসের সাউন্ড এইগুলো কি কোন বাদ্য যন্ত্রের সাউন্ড? যদি কোন বাদ্যযন্ত্রের সাউন্ড হয় বা আপনার বানানো সাউন্ড কোন বাদ্য যন্ত্রের সাউন্ডের অনুসরণ করে; তাহলে এইসব ভিন্নভাবে বানানো সাউন্ড কতোটুকু হালাল? কখনও কি এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করে ফতোয়া নিয়েছেন?
আর যদি এইসব সাউন্ড কোন বাদ্য যন্ত্রের সাউন্ডের অনুসরণ না করে; তাহলে তা নিয়ে আলেমগণ ভাবতে পারেন। যারা ফতোয়া নিয়ে কাজ করছেন; আপনারা কি এইভাবে ভেবে দেখেছেন? ধরুন, বক্তা বয়ান করছেন। মাইকে একটু বিট, একটু বেজ, ইকো, ডিলে, ট্রেবল দেওয়া হলো। এইগুলো কি বাদ্য যন্ত্রের আওয়াজ? এইগুলো বয়ানের সাউন্ড রিকর্ডিং কিংবা মাইকে ব্যবহার জায়েজ?
উসূল হলো যা আসলগতভাবে জায়েজ তা জায়েজ। হারাম হওয়ার জন্য নস অথবা ইজমা লাগবে। (এমনটাই তো! ভুল হলে একটু মূল এবারতখানা দিবেন প্লীজ।) সেই দিক থেকে আমাদের ইসলামী সঙ্গীতের ব্যাকগ্রাউন্ডে যে সাউন্ড থাকে তাই কি মিউজিক। অনেকেই ব্যাকগ্রাউন্ডে সাউন্ড থাকলেই মিউজিক বলে ফেলেন। অটোটিউনকেও কেউ মিউজিক বলেন। সাউন্ড রিলেটেড মানুষদের ভাষায় অটোটিউন ও স্পিচ কারেকশন কোন বাজনা না।
এবার আসুন যে জিনিসটা আসলেই কোন বাদ্যযন্ত্র না। তার সাউন্ডের হুকুম কী হবে? যেমন সাইকেলের বেলের টুংটাং। পানির কলতান। সিরামিকের বাটির টুংটাং। থালাবাসনের ঝনঝন। গামলা বা বালতিতে পানি রেখে তাতে হাত দিয়ে তৈরি আওয়াজ। পাতার মর্মর। বাতাশের শন শন। বাচ্চারা যখন সাইকেলের চাকা ঘুরায় তার পনপন। ঝর্ণার পানি ফতনের ধ্বনি। ট্রেনের চলার ঝকঝকাঝক। পাখির কুজন। অথবা এইরকম যত সাউন্ড আছে; যা সঙ্গীতের নেপথ্যে অনেকেই ব্যবহার করেন। সেইগুলোও কি বাজনার হুকুম পাবে?
একটু যদি গভীরভাবে ভাবি তাহলে শিল্পী ও শ্রোতা উভয়েই সতর্ক হতে পারেন। হারাম থেকে বাঁচতে পারি। আবার ব্যক্তিগত প্রবৃত্তির কারণে ফতোয়ার ব্যবহার থেকে বাঁচতে পারি।
চার.
সংকটের কারণ কী? ইসলামী সঙ্গীত এমন লাগামহীন হচ্ছে কেনো? এর কয়েকটা কারণ একটু ভেবে দেখতে পারি। যখন ইন্টারনেটের কল্যাণে বিশ্ব সঙ্গীতের সঙ্গে আমাদের এই দেশের ইসলামী গানের লোকেরা পরিচিত হচ্ছিল। তখন মাহের জাইন, হ্যারিস জে, ইমাদ রামী, সামী ইউসুফ ও আহমদ বুখাতির পপুলার পার্সন। মেহের ও বুখাতিরের সিনেমাটোগ্রাফি ও অন্যদের সফট-হার্ড মিউজিক আমাদের এই অঙ্গণটিকে হীনম্মন্য ও এলোমেলো করে দেয়। কারণ--
ক. সাইমুম তখনও গলা ও একটা নির্দিষ্ট টাইপের নাশীদের প্লাটফর্ম।
খ. আজাদ ভাই প্যারোডি ও গণসঙ্গীতের ভেতরে মগ্ন।
গ. মুহিব খান একটা অসঙ্গীতীয় আবহে কাব্যিক ও চৈন্তিক গণসঙ্গীত নিয়ে মাঠে।
এর কোনটাই মাসপিপলের সঙ্গে যথার্থভাবে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারেনি। আর নতুন শিল্পীদের জন্য বিশেষ কোন সঙ্গীতীয় আদর্শ তৈরি করতে পারেননি। ফলে আমাদের এই ইসলামী সঙ্গীত মাহের আর বাকিদের সঙ্গে নিজেদের কম্পেয়ার ও কম্পিট করতে শুরু করল। অপরদিকে বুদ্ধিজীবী শ্রেণি প্রেসার ক্রিয়েট করতে থাকেন; ভার্সেটাইল, ক্লাসিক, কাওয়ালী, আধুনিক ও গণমানুষের জন্য ইসলামী সঙ্গীত তৈরি করার জন্য। ইসলামী সঙ্গীতের অন্তর্গত সব অনুসঙ্গ বাদ দিয়ে একটা নিরেট সঙ্গীত হিসেবে দেখতে শুরু করলাম আমরা।
সঙ্গীত, কন্টেন্ট, সিনেমাটোগ্রাফি, ভিডিও মেইকিং, টিউন আর অডিয়েন্সে ডুবে ইসলামী সঙ্গীতের রুহানিয়্যাত ও দ্বীনী কাজের উপযোগ হারালাম এই সময়ে এসে।
এর কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম একটা কারণ আমরা বা আমাদের সিনিয়র প্রভাবশালী ইসলামী ব্যক্তিত্বগণ ওদেরকে লীড দিতে চাননি। আর যারা চেয়েছেন তারা তাদের ব্যক্তিগত দুর্বলতা আর নিজস্ব ব্যস্ততার কারণে পারেননি।
আবার এই অঙ্গনের কিছু গ্রুপবাজিও এই অঙ্গনের শর্বনাশের জন্য দায়ী। কিছু সিনিয়র শিল্পির অর্থনৈতিক ও নেতৃত্ব বিষয়ক লোভও নবীন শিল্পীদের নিয়ন্ত্রণ ও ইসলাহের জন্য বাধা।
এর উত্তরণের পথ একটাই। আমাদের সতর্ক দৃষ্টি। ভুলটাকে ভুল বলা। ভালোবাসে ভালো। ভুল থেকে ফেরানোর জন্য দরদী আহ্বান। প্রয়োজনে দুইয়েকটা ধমক। মুরুব্বি আলিমগণের লাঠির বাড়ি খেতেও শিল্পীদের প্রস্তুত থাকতে হবে। নিজেদের বড়দের সামনে সবিনয়ে উপস্থাপন করা জরুরী। মানার মাদ্দা আরও বেশি জরুরী।
পাঁচ.
ইসলামী সঙ্গীত এখন সমাজের বাস্তবতা। একে নিয়ে সিনিয়র আলিমগণের ভাবা উচিত। বখাটে ও মেধাহীন ছেলেরা যেনো সুরের পুজিতে যাচ্ছেতাই করতে না পারে সেই দিকেও খেয়াল রাখা উচিত।
প্রতিটি পরিবারের উচিত সঙ্গীত যেনো কারো ক্যারিয়ার না হয় সেই দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা। পড়াশোনার ক্ষতি করে যেনো কেউ সঙ্গীত চর্চা না করে। ইসলামী সঙ্গীত একটা মেধা ও সুর নির্ভর পারফর্মাং আর্ট। শুধু সুর যেমন বিপদের কারণ হতে পারে এখানে। ঠিক তেমনই সুরহীন মেধাও জটিলতা তৈরি করতে পারে।
ফলে এই জায়গাটাতে শিল্পী ও শিল্পীগোষ্ঠীদেরই নিজ গরজে নিজেদের উপদেষ্টা নির্বাচন করতে হবে। যেনো চাইলে বা প্রয়োজন মনে হলে তারা আমাকে সঙ্গীত থেকেই দূরে নিয়ে যেতে পারেন।
এছাড়া এই অঙ্গন ও ইন্ডাস্ট্রি যতো বড় হতে থাকবে এর ভেতরে ফটকাবাজ বাড়তে থাকবে। ট্রেন্ড ও লাইমলাইটে থাকতে হারামকে সহজিকরণ চলতে থাকবে। অপরদিকে ইসলামী সঙ্গীতের হেটার্সও বাড়তে থাকবে। বাড়তে থাকবে 'উন্নাসিক হারাম মিউজিক লাভার' ইসলামী সঙ্গীতের বুদ্ধিজীবীও।
তর্ক-বিতর্ক আর দোষাদোষী কোন সমাধান নয়। বয়ানের ময়দান ও নাশীদের ময়দান দুইটাই বিপদগ্রস্ত। উদ্ধারের জন্য সচেষ্ট হওয়া সকলের দায়। সকলের দায়িত্ব। শব্দ আর ভাষা আছে। আছে অডিয়েন্স। আছে ভক্ত। আর আমি আক্রমণ করে ফেললাম। এইভাবে পরিবর্তন আসে না। পরিবর্তনের জন্য হৃদয়ের আকুলতা লাগে। রাগ-ক্ষোভ-জেদ না। এইসব নেগেটিভ এটিট্যূড কাইজ্জার ফিল্ড তৈরি করে। এক দলকে মজা নিতে উদ্ধুদ্ধ করে।
সিদ্ধান্ত এখন আমাদের...


এই পোস্ট সংক্রান্ত আপনার মূল্যবান কমেন্টটি করার জন্য “মাসিক গীতিকবিতার“ পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলো।
পুরো লেখাটি পড়লাম। অসাধারণ লিখেছেন সাইফ সিরাজ ভাই। আল্লাহ উনার কলমকে আরো শাণিত করুন।
উত্তরমুছুনএই পোস্ট সংক্রান্ত আপনার মূল্যবান কমেন্টটি করার জন্য “মাসিক গীতিকবিতার“ পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলো।